0
(0)

হাসান বিন নোমান//
আল্লাহতায়ালার ফজলে আমরা পবিত্র মাহে রমজানের দিনগুলো অতিবাহিত করছি। আমরা জানি, রমজানের দিনগুলোতে আমাদের প্রিয় নবী (সা.) ঝড়ো গতিতে দান খয়রাত করতেন। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের মধ্যে অনেকেই আছেন রমজানে দান খয়রাত করেন কিন্তু যে হারে করা প্রয়োজন সেভাবে করেন না। এছাড়া শুধু রমজান মাস আসলেই হাতে গনা কিছু মানুষকে দেখা যায় যাকাতের কাপড় বিতরণ করতে, যদিও এটি ইসলামি পদ্ধতি নয়, যাকাতের অর্থ জমা করাতে হয় বায়তুল মালে।
আমরা যেভাবে নামাজ আদায় করাকে ফরজ জানি তেমনি যাকাত প্রদানও ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর একটি। পবিত্র কোরআন করিমে আল্লাহতায়ালা সালাতের পাশাপাশি যাকাত প্রদানের নির্দেশও দিয়েছেন। সালাতের সাথে যাকাতের সম্পর্ক ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। সংগতিসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে যাকাত ব্যতীত সালাত কায়েম হওয়া সম্ভব নয়। মূলত সালাত ও যাকাত ব্যতীত ইসলামী জীবন গঠনই অসম্ভব।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা স্বর্ণ রৌপ্য মজুদ করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, হে নবী! তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিন। সেদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তদ্বারা তাদের কপাল, পার্শ্বদেশ এবং পিঠকে সেক দেওয়া হবে (এবং তাদের বলা হবে) এটা তার প্রতিফল যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা করেছিলে। সুতরাং তোমাদের ধনভান্ডারে শাস্তি আস্বাদন কর’ (সুরা আত-তাওবা: ৩৪-৩৫)।
হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, যাকে আল্লাহতায়ালা সম্পদ দিয়েছেন কিন্তু সে তার জাকাত আদায় করে না, উক্ত মালকে কিয়ামতের দিন তার জন্য বিষধর সাপে পরিণত করা হবে। যার চোখের ওপর কালো দাগ পড়ে গেছে। অতঃপর তা স্বীয় চোয়ালদ্বয় দ্বারা তাকে কামড় মারবে এবং বলবে আমি তোমার ধনভান্ডার, আমি তোমার মাল’ (বোখারি)।
আসলে যাকাত সম্পদ ও ব্যক্তিকে পবিত্র করে। যেভাবে আল্লাহপাক বলেন, ‘তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর, যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পার এর মাধ্যমে’ (সুরা আত-তাওবা: ১০৩)।
পৃথিবীর বুকে মানুষ যাতে সুখে শান্তিতে সুষ্ঠ ও সুন্দর ভাবে জীবন যাপন করতে পারে তার জন্যই বান্দার দয়াময় আল্লাহতায়ালা জাকাতের ব্যবস্থা করেছেন। শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির নামই ইবাদত নয়। সংসারে জন্মগ্রহণ করে সংসারধর্ম রক্ষা করে, সত্য ও সঠিক পথে চলে মানব জীবনে প্রতিটি কর্মই ইবাদতের মধ্যে শামিল।
ইসলামের ইতিহাস থেকে জানা যায়, মহানবী (সা.) আজানের পর নিজ কক্ষ থেকে বের হয়ে মসজিদে আগমন করতেন এবং সমবেত মুসল্লিগণের সাথে বসতেন এবং উপস্থিত অনুপস্থিত প্রত্যেক মুসলিম ভাই বোনদের খবরাখবর নিতেন ও প্রত্যেকের জাগতিক সমস্যার সমাধান করতেন। কিন্তু আজ আমরা কি দেখি, আমার পাশের ঘরের মানুষ কষ্টে দিনাতিপাত করলেও আমি তার কোন খবর রাখছি না। ইসলাম শুধু উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হয় নাই। বাস্তব জীবনে যাকাতকে ফরজ কার্যের আওতায় এনে প্রতিফলন ঘটিয়েছে। যাকাত দ্বারা দরিদ্র জনসাধারণের জন্য একটি চিরস্থায়ী দানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মহানবী (সা.) জাতীয় দৈন্য দুর্দশার মুক্তি সাধনায় বহু ত্যাগ স্বীকার করে তিনি বায়তুল মালকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামলে মুসলমান জাতির প্রাণশক্তি ছিল বায়তুল মাল। তখন যাকাত আদায় করার জন্য আদায়কারী নিযুক্ত ছিল। তারা নিয়মিত জাকাত আদায় করে বায়তুল মালে জমা দিতেন এবং তা থেকে দরিদ্র জনসাধারণের মধ্যে যথাবিধি বণ্টন এবং ইসলামের প্রচার ও প্রসার কল্পে ব্যয়িত হতো।
মহানবীর (সা.) প্রাণপ্রিয় সাহাবীগণের (রা.) অধিক সংখ্যকই ছিলেন দরিদ্র ও অভাবী। নিজেদের ব্যবহারিক জীবনে তারা বহু অভাব অনটনে থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর পথে দ্বীনের কাজের জন্য বহুবিধ পথে তারা সম্পদ ব্যয় করতেন। এ সকল সাদাকাতের মধ্যে যাকাত ছিল অগ্রগণ্য ও সর্বব্যাপী। সব জিনিসের ওপর যাকাতের একটি অংশ বরাদ্ধ ছিল। উৎপাদিত ফসলের ওপর, বানিজ্য পণ্যের ওপর, ঘোড়া, উট ও গবাদি পশুর ওপর, বাগ-বাগিচা ইত্যকার সকল জিনিসের ওপর যাকাতের নির্দেশ আছে। তাদের দরিদ্র ও অভাব সত্ত্বেও কখনো কোন নির্দেশে তারা আপত্তি তোলেন নি। অধিকন্তু পরম আন্তরিকতা ও উদারতার সাথে যাকাত, সদকা, দান খয়রাত করে গিয়েছেন।
যাকাত আদায় করলে মহান আল্লাহপাকের কাছ থেকে আমরা যা লাভ করব তাহল, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সৎ কাজ করেছে, নামায প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং যাকাত প্রদান করেছে, তাদের জন্য পুরস্কার তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে। তাদের কোন ভয় নাই এবং তারা দুঃখিত হবে না’ (সুরা বাকারা: ২৭৭)।
এছাড়া আল্লাহর রাস্তায় ধনসম্পদ ব্যয় করলে সম্পদ কমে না বরং বৃদ্ধি হয়। যেভাবে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মত, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শীষে একশ করে দানা থাকে। আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ’ (সুরা বাকারা: ২৬১)।
মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে কোন কিছু ব্যয় করবে তাকে সাতশত গুণ ছওয়াব প্রদান করা হবে’ (আহমাদ)। দান খয়রাতে প্রশান্তি লাভ হয়। হাদিসে আছে রসুল (সা.) বলেন, ‘দান-ছাদকা গুনাহ মিটিয়ে ফেলে, যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে ফেলে’ (সহিহুল জামে)।
আল্লাহর রাস্তায় আমাদের এ দান জাহান্নামের পর্দার কারণ হবে। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘হে আয়েশা! অভাবীদের কিছু না দিয়ে ফিরিয়ে দিয়ো না, যদিও তা কেবল খেজুরের একটি টুকরা হয়। হে আয়েশা! গরীবদের ভালবাস এবং তাদেরকে তোমার কাছে সাহায্যের জন্য আসতে দাও। তখন আল্লাহতায়ালা অবশ্যই কিয়ামতের দিন তার কাছে স্থান দিবেন’ (ইবনে মাজাহ, তিরমিযি)।
আল্লাহর রাস্তায় যারা পবিত্র ও হালাল সম্পদ দান করেন তাদের জন্য ফেরেশতা দোয়া করেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন দানকারীর জন্য দোয়া করে, হে আল্লাহ! দানকারীর মালে বিনিময় দান কর অর্থাৎ সম্পদ বৃদ্ধি কর আর দ্বিতীয়জন কৃপণের জন্য বদ দোয়া করে বলেন, হে আল্লাহ কৃপণের মালে ধ্বংস দাও’ (বোখারি ও মুসলিম)।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.