বিলুপ্ত পালকি ঠাঁই জাদুঘরে

0
(0)

নিউজ ডেস্ক : ‘বর আসবে পালকি চড়ে টোপর মাথায় দিয়ে’ কিংবা ‘বাক বাকুম পায়রা মাথায় দিয়ে টায়রা বউ সাজবে কাল কি চড়বে সোনার পালকি’- এমনি বহু ছড়া, কবিতা, গানের কথায় পালকি রয়েছে। গ্রাম বাংলায় ঘুরে এখন আর পালকি যেনো চোখেই পড়ে না। প্রাচীন ও মধ্য যুগের আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে পালকি এখন আমাদের ইতিহাসের অংশ। বিলুপ্ত পালকি ঠাঁই করে নিয়েছে ঢাকা জাদুঘরে। পালকি একটি প্রাচীনতম লোকযান। যারা পালকি বহন করতো তাদেরকে বলা হতো বেহারা। পালকি উঠে যাওয়ার কারণে বেহারারা চলে গেছে অন্য পেশায়। সে সময় পালকির পাশাপাশি চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হতো গরুর গাড়ী, ঘোড়ার গাড়ী, নৌকাও ছিলো আরেক যোগাযোগের উল্লেখযোগ্য মাধ্যম।
তবে পালকি ছিল সে সময় গ্রামীন সমাজ ব্যবস্থার আভিজাত্যের প্রতীক। সে সময় শুধু বর কিংবা কনে-ই পালকিতে চড়তো না৷ বড় বড় জমিদাররাও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পালকিতে করে যাতায়াত করতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কুষ্টিয়া থেকে শিলাইদহে আসতেন পালকিতে চড়ে। আত্রাই থেকে পতিসর যেতেন পালকিতে করেই সেতো প্রায় ৯০ বছর আগেকার কথা। হিন্দুদের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থে যে ৪১টি জাতের কথা উলেস্নখ করা হয়েছে তাতে ডোলাবাহী বা ডুলি বেহারা বা দুলিয়া বা দুলেদের কথা জানা যায়। এই বংশ তালিকায় পালকি বাহকদের স্থান হয়েছে চিল্লিশ নম্বরে। এরা সমাজের একান্ত প্রয়োজনীয় শ্রমিক হলেও এদের বসবাস ছিল ভদ্র পল্লীর বাইরে। এদের ছোঁয়া কোনো খাবার বা পানীয় উচ্চ বংশের লোকজন স্পর্শ করতো না। স্পর্শ করলেই হিন্দু মুরম্নব্বীরা বলে উঠতেন- ‘জাত গেলো, জাত গেলো। রাজা কেশব সেনের লিপিতে হাতির দাঁতের তৈরি বাহু দণ্ডযুক্ত পালকির উল্লেখ রয়েছে।
রাজা বল্লম সেনের সময় পালকির গুরুত্ব সবচাইতে বেশি ছিল। রাজা-বাদশাদের যুগে অনেক রাজাই শত্রুদের চোখে ধুলো দিয়ে গোপনে পালকিতে চড়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও পালকীর ব্যবহার ছিল রণ কৌশলের অংশ হিসাবে। ১৯৭১ সালের ১৫ই আগষ্ঠ চট্টগ্রাম বন্দরকে অকেজো করে দিতে নৌ কমন্ডোরা যে ডিনামাইড অপরেশন করেছিল সেই ডিনামাইড খান সেনাদের কঠোর নিরাপত্তা উপেক্ষা করে বর যাত্রী বেশে পালকিতে চড়ে মুক্তিযোদ্ধারা তা পৌছে দিয়েছিল নৌ কমন্ডোদের হাতে। এই অপারেশনে পালকিকে যুদ্ধাযান হিসাবে ব্যবহার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ হিসাবেই স্বর্নাক্ষরে লেখা আছে এই পালকির নাম কিন্তু এই আধুনিক যুগে বাংলাদেশের কোথাও আর পালকি ব্যবহৃত হচ্ছে না।
গ্রামবাংলার বর-কনেরাও আর পালকিতে চড়ে না। এখনকার বর-কনেরা গাড়িতে চড়েই শ্বশুর বাড়ি যায়। তবে পালকি এখনো আমাদের ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে আমাদের অন্তরকে ধারন করে আছে। অভিজাত শ্রেনীর বিয়ের আসরে ফ্যাশন হিসাবেও এখনো পালকীর এক ধরনের ব্যবহার দেখা যায়। প্রবাসেও বাঙ্গালী কমিউনিটির বিয়ের অনুষ্ঠানে পালকীর প্রতীকী ব্যবহার অভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বর আসছে ঘোড়ায় চড়ে আর কন্যা আসছে পালকীতে চড়ে। পাচ তারা আলিশান হোটেলের আলো ঝলমল পরিসরে বিয়ের আসরে পালকী এবং ঘোড়ার গাড়ীর ব্যবহার মনের মাঝে লালিত সেই সেই গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যকেই ধারণ করছে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.