আজানের আওয়াজে জেগে ওঠে পৃথিবী

সবুজবাংলা ওনলাইন ডেস্কঃ
আজান পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুরধ্বনি। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য আজান প্রচারিত হয়। আজানের ধ্বনি মুমিনের মর্মে মর্মে বেজে ওঠে। মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে আজান মহান আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা। আজান নামাজের জন্য ডাক দিয়ে যায়। মহাকল্যাণের হাতছানি দেয়। আজান নব উদ্যমে জাগরণের প্রতীক। ফজরের আজানের আওয়াজে পৃথিবীর ঘুম ভাঙে। কোনো কোনো গবেষণা বলছে, পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে সব সময় আজান হয়। লিখেছেন আতাউর রহমান খসরু ও মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
যেভাবে পৃথিবীতে এলো আজানের ধ্বনি
পৃথিবীর মধুরতম শব্দ-সুর আজানের। আজানের ধ্বনিতে জেগে ওঠে পৃথিবী, জেগে ওঠে মানবহৃদয়। পাপ-পঙ্কিলতার জীবন ছেড়ে আল্লাহর আনুগত্যের পথে ধাবিত হয় মানুষ আজানের শব্দ শুনে। মহাকবি কায়কোবাদ লিখেছেন, ‘কে ঐ শোনালো মোরে আযানের ধ্বনি,/মর্মে মর্মে সেই সুর,/বাজিলো কি সুমধুর,/আকুল হইলো প্রাণ, নাচিলো ধমনি।/কি মধুর আযানের ধ্বনি।’
মানুষের হৃদয় আকুল করা, প্রাণে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা আজানের ধ্বনি পৃথিবীতে এসেছিল মধুর এক ঘটনার মধ্য দিয়ে। মহান আল্লাহ স্বপ্নযোগে তাঁর কয়েকজন পুণ্যাত্মা বান্দার হৃদয়ে ঢেলে দিয়েছিলেন এই পবিত্র ধ্বনি। অবচেতনে তাঁদের শিখিয়েছিলেন তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণার এই অভিনব পদ্ধতি। মূলত আজানের সূচনা হয়েছে নামাজের জামাত অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা থেকে। মক্কিজীবনে নামাজ ফরজ হলেও সেখানে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়ের অবাধ সুযোগ ছিল না। সেখানে নামাজ ও নামাজের জামাতে ছিল নানা প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু মদিনায় হিজরতের পর আল্লাহ মুসলমানের জন্য পৃথিবী প্রশস্ত করে দিলেন। ফলে তারা স্বাধীনভাবে ইবাদতের সুযোগ পেল। অন্যদিকে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের নামাজের সময় সম্পর্কে অবহিত করা এবং মসজিদে আহ্বানের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই প্রয়োজন পূরণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আজান ও তার বিধান দান করেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, মুসলমানরা যখন হিজরত করে মদিনায় এলো, তখন তারা নামাজের জন্য অনুমানের ভিত্তিতে একটা সময় ঠিক করে নিত এবং সে অনুযায়ী সমবেত হতো। তখন নামাজের জন্য কেউ আহ্বান করত না। একদিন তারা এ বিষয়ে আলোচনা করল। কেউ বলল, খ্রিস্টানদের মতো নামাজের সময় ঘণ্টা বাজানো হোক। আবার কেউ কেউ প্রস্তাব দিল, নাসারাদের মতো শিঙা বাজানো হোক। হজরত ওমর (রা.) বলেন, তোমরা কি নামাজের সময় সবাইকে আহ্বান করতে একজন লোক পাঠাতে পারো না? তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত বেলালকে বলেন, ‘বেলাল, তুমি ওঠো এবং নামাজের জন্য আহ্বান করো।’ (বুখারি ও মুসলিম)
আলোচ্য হাদিস থেকে জানা যায়, জামাতের জন্য সবাইকে একত্র করার পদ্ধতি নির্ধারণের প্রথম বৈঠকে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত ওমরের প্রস্তাব পছন্দ করলেও আহ্বানের শব্দ কী হবে সে সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সে বৈঠক মুলতবি হয়ে যায়। রাসুলের দরবারে উপস্থিত সব সাহাবি সেদিন ঘরে ফিরে যান গভীর চিন্তা নিয়ে এবং রাতের ঘুমে অনেকেই স্বপ্নযোগে আজানের শব্দগুলো শিখে নেন। আর এ স্বপ্নটা আল্লাহর পক্ষ থেকে ছিল বলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ (রা.) বলেন, ‘সকাল হলে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে গেলাম। তাঁকে আমার স্বপ্নের কথা বললাম।
তিনি বলেন : যাও, বেলালের সঙ্গে যাও। কেননা তার কণ্ঠস্বর তোমার থেকে উঁচু ও দীর্ঘ। সুতরাং তুমি তাকে শিখিয়ে দাও, যা তোমাকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে এগুলো দিয়ে আজান দেবে।’ হজরত জায়েদ বলেন, ‘যখন ওমর (রা.) নামাজের জন্য বেলালের আজান শুনতে পেলেন, তখন তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উদ্দেশে বের হলেন, (এবং এত তাড়াতাড়ি চলতে লাগলেন যে) তিনি তাঁর চাদর টানতে টানতে এ কথা বলছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেই মহান সত্তার নামে শপথ করে বলছি, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, বেলাল যা বলছে আমি তেমনই স্বপ্ন দেখেছি। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য।’ (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)
এভাবেই পৃথিবীতে এসেছিল আজানের পবিত্র ধ্বনি। মহান আল্লাহ অনুগ্রহ করে শিখিয়েছিলেন কিভাবে তাঁর বড়ত্বের ঘোষণা দিতে হবে, কিভাবে তাঁর রাসুলের রিসালাতের সাক্ষ্য দিতে হবে। তিনি শুধু আজানের ধ্বনি ও শব্দ শেখাননি, বরং যারা পবিত্র ধ্বনির মাধ্যমে মানুষকে আহ্বান জানাবে এবং যারা সেই আহ্বানে সাড়া দেবে, সবার জন্য বিশেষ মর্যাদার ঘোষণা দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের জন্য দোয়া করেছেন, ‘ইমামরা হলেন উম্মতের দায়িত্বশীল আর মুয়াজ্জিনরা আমানতদার। হে আল্লাহ! আপনি ইমামদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন আর মুয়াজ্জিনদের ক্ষমা করে দিন।’ (সুনানে আবি দাউদ)।
আজানের গুরুত্বপূর্ণ ১০ মাসআলা
১. আজান ইসলামের অন্যতম নিদর্শন। সুতরাং কেউ আজান অস্বীকার করলে তার ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে।
২. আজান দেওয়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। তবে মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে একজন আজান দিলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। আর কেউ না দিলে সবাই গুনাহগার হবে।
৩. সাহাবায়ে কেরাম (রা.) আজান অস্বীকারকারী শহরবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বৈধ মনে করতেন।
৪. আজান একটি ইবাদত। তার শব্দ ও পদ্ধতি উভয়টি রক্ষা করা আবশ্যক। সুতরাং আজান সময়মতো, আরবি ভাষায় ও দাঁড়িয়ে পশ্চিমমুখী হয়ে দিতে হবে।
৫. আজানের শব্দ বিকৃত না হওয়া পর্যন্ত আজানের শব্দে সুর দেওয়া বৈধ।
৬. আজান দেওয়ার জন্য মুসলিম হতে হবে।
৭. শিশুর আজান বৈধ। তবে শিশু অবুঝ হলে তার আজান অগ্রহণযোগ্য।
৮. আজান পুরুষের দায়িত্ব।
৯. উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে আজান দেওয়া মুস্তাহাব; তবে আবশ্যক নয়।
১০. হানাফি মাজহাব অনুসারে আজানের উত্তর দেওয়া ওয়াজিব। অন্য মাজহাব মতে মুস্তাহাব।
সূত্র : মাসায়িলুল মুহিম্মাহ ফিল আজানি ওয়াল ইকামাহ
(তথ্য সুত্র জনপ্রিয় দৈনিক কালের কন্ঠের ইসলাম ও জীবন পাতা থেকে)